
কেবল শনি ও রবিবারেই খেলার অনুমতি
- ছেলেরা কম্পিউটার গেইমে সময় নষ্ট করবে! না, এর জন্য আমরা নরওয়েতে আসিনি। ঘরে তাদের কেবল শনি ও রবিবারেই গেইম খেলার অনুমতি রয়েছে, বলেন নাশাত (৪২)।
- ছবি ও লেখা: Eva Alnes Holte
- Translation: Ratan.
- Norwegian text here.
- English
আলৌ (Alou) পরিবারের সাথে আমাদের দেখা অসলোর গ্রেফসেনে (Grefsen)। মা বুশরা (৩৭) আমাদের কফি দিলেন। সাথে খেঁজুর, ওট ও মধুর তৈরি কেক। নাশাত ও বুশরা দম্পতির দুই ছেলে, মোহাম্মদ (১৫) ও দুভলান (১৪)। তারা আমাদের সাথে তাদের অবসরের প্রিয় বিষয় কম্পিউটার গেইম প্রসঙ্গে কথা বলবে।
– সিরিয়াতে থাকতে আমাদেরকে যত ইচ্ছে খেলতে দেয়া হতো, বলে দুভলান। তখন আমরা বয়সেও ছোটো ছিলাম।
– তখন তোমাদের স্কুলে যেতে হতো না, উত্তর দিলেন বাবা।
পারিবারিক পুনর্মিলন
নাশাত নরওয়েতে আসেন ২০১৫ সালে। বুশরা এবং ছেলেরা আসে এর এক বছর পরে। ছেলেদের বয়স তখন যথাক্রমে ১১ ও ১০। সিরিয়াতে যুদ্ধের জন্য তাদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বাবা-মা।
– আমরা খুশি যে এখানে ছেলেরা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে, বলেন নাশাত। মোহাম্মদ এবং দুভলান দুজনই একই ক্লাসে পড়ে।
– দুজনেই বেশ ভালো করছে স্কুলে। তবে এখনও অনেক শব্দ আয়ত্তে নিতে পারেনি, মা বলেন।
– এজন্য তাদেরকে অন্য ছাত্রদের থেকে বেশি পড়াশুনা করতে হবে।
কম্পিউটার গেইম খেলা বিষয়ক তর্ক-বিতর্ক
অন্য সব বাবা-মায়ের মতো আলৌ দম্পতিরও চাওয়া ছিল ছেলেরা ঠিকমতো হোমওয়ার্ক করুক এবং পড়াশুনায় ভালো করুক। কিন্তু প্রথম দিকে তারা অনেক বেশি গেইম খেলত, যার প্রভাব পড়েছিল স্কুলের ফলাফলে। পরবর্তীতে বাবা-মা সিদ্ধান্ত নেন যে তাদেরকে কেবল সপ্তাহান্তেই খেলার সুযোগ দেয়া হবে।
– এ নিয়ে বেশ ঝামেলা হয়েছে ঘরে। তিন তিনবার তর্ক-বিতর্কের পরে তারা বুঝতে পেরেছে যে আমরা তাদের খারাপ চাই না, বরং ভালোটাই চাই, বলেন বুশরা।
তিনি জানান তিনি এমন কিছু বাবা-মাকে চিনেন যারা সন্তানদের গেইম খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তবে তাঁর মতে নিয়ন্ত্রণ যে সবসময় ভালো ফল দেয়, এমনও নয়। শিশুর ব্যক্তিত্বভেদে এর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
– আমি স্কুলে ভালো করছি, বলে দুভলান। সে বাবার দিকে তাকালে বাবা তারিফসূচক মাথা নাড়েন।
কম্পিউটার গেইম শিশুদের সামাজিক করে তোলে
দুই ভাই অনেক সময়ই একই টিমের হয়ে খেলে থাকে, আবার কখনো একে অপরের প্রতিদ্বন্দী রূপে। ঠিক একইভাবে কখনো তাদের বন্ধুদের সাথে কিংবা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।
– আমি এটা বলতে চাই না যে গেইম সবসময়েই খারাপ। গেইম তাদেরকে সামাজিক করে তুলতে সাহায্য করেছে, বলেন বুশরা।
তিনি জানান জার্মানিতে বাস করা তাদের এক চাচাত বোনের সাথে তাদের ভালো যোগাযোগ রয়েছে এই গেইমিংয়ের জন্যই। তারা প্রায়শই একসাথে গেইম খেলে থাকে। সিরিয়াতে থাকাকালীন সময়টাতে তারা একসঙ্গে কাটাতো।
– মোহাম্মদ ও দুভলান গেইম না খেললে হয়তো ঐ চাচাত বোনের সাথে কোনো সম্পর্কই থাকত না। কারো সাথে কথা বলার জন্য দুই পক্ষের একটা সাধারণ বিষয় প্রয়োজন।
.ফোর্টনাইট
দুভলান ফোর্টনাইট খেলতে পছন্দ করে। মোহাম্মদের পছন্দ অবশ্য ফিফা।
– আমি গোলাগুলির গেইম একদমই পছন্দ করি না, মা বলেন। তিনি শঙ্কিত এসব খেলা ছেলেদের কাছে ফেলে আসা সিরিয়ার ঘটনাবলী মনে করিয়ে দিতে পারে।
স্কুল না থাকলে অথবা যখন বাবা-মা দুজনই কাজে থাকেন, তখন ছেলেরা যত ইচ্ছে গেইম খেলতে পারে। বুশরা খুশী যে অবসরে তাদের কিছু একটা করার আছে, কিন্তু সে তাদের নিয়ে চিন্তিতও, বিশেষ করে যখন তারা অপরিচিতদের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহের গেইম খেলে।
– খেলা চলাকালীন কেউ যদি গালাগালি করে বা বাজে শব্দ ব্যবহার করে, আমি তাকে ‘মিউট’ করে দিই, দুভলান জানায়।
বাবা চিন্তিত খেলার সময়ে তাদের চীৎকার চেঁচামেচি নিয়ে, বিশেষ করে যখন তারা ঘরে একা থাকে। – আমাদের প্রতিবেশী রয়েছে, তিনি বলেন।
ফিফা
মোহাম্মদ ফিফা খেলতে পছন্দ করে।
– তোমাকে শুরু করতে হবে দুর্বল একটা দল নিয়ে, তারপর ক্রমে নতুন খেলোয়াড় কিনে কিনে ওপরে উঠতে হবে, সাংবাদিককে খেলাটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয় মোহাম্মদ।
– ফিফা খেলতে তোমাকে মস্তিস্ক ব্যবহার করতে হবে। তোমাকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে আগাতে হবে, মোহাম্মদ বলে। সে জানায় এ ব্যাপারে সে এবং তার বন্ধুরা শিক্ষকদের সাথেও আলাপ করে থাকে।
– ফিফা গেইমের মাধ্যমে আমরা বেশি কিছু ইংরেজি শব্দ শিখতে পারি, তবে সেগুলো সাধারণত ফুটবল সম্পর্কিত।
যুবসংঘ (Ungdomklubben)
বুশরা জানান ছেলেরা স্কুলশেষে একটা ক্লাবে যায়। সেখানে তারা হোমওয়ার্ক করে এবং গেইম খেলে।
– ক্লাবে তাদের তত্ত্বাবধানের জন্য বড়রা আছেন। সুতরাং আমি মনে করি ওখানে গেইম খেলতে কোনো সমস্যা নেই।
এছাড়াও অবসরে তাদের অন্য কার্যক্রম রয়েছে। দুভলান সাঁতারে যায় এবং মোহাম্মদ ফুটবল খেলে। বুশরা খুশি যে কম্পিউটার গেইমের বাইরেও তাদের কিছু করার আছে।
– খুব বেশি গেইম খেলা স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ, খারাপ পরিবারের জন্যও, বুশরা মনে করেন।
– বাবা-মায়ের উচিত শিশুদের নিয়ে মাঝেমধ্যে বসা এবং কথা বলা। তাদের কোথাও কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা, এটা জানা উচিত। শারীরিক ব্যায়ামের উপকারিতা আছে। সৌভাগ্যক্রমে স্কুলে তাদের জিম রয়েছে এবং দুভলান সাঁতার এবং মোহাম্মদ ফুটবল পছন্দ করে।
রবিবারে ছেলেদের নিয়ে হাঁটতে বের হতে পছন্দ করে নাশাত। কিন্তু ছেলেরা তখন ব্যস্ত থাকে কম্পিউটার গেইমে।
– আমাদের বাসার কাছের প্রকৃতিটা সুন্দর। আমার এখানে হাঁটতে ভালো লাগে, বলেন তিনি।
[ছবিঃ]
– ছেলেমেয়েদের এত বেশি গেইম খেলা উচিত নয় যাতে ঘরের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। এ ব্যাপারে বাবা-মায়ের উচিত শিশুদের সাথে কথা বলা, বলেন বুশরা।
মোহাম্মদ (সর্ববামে) বতর্মানে প্রচুর ফিফা খেলে, দুভলানের পছন্দ ফোর্টনাইট।
নাশাত (বামে) শঙ্কিত খেলার সময়ে তাদের চীৎকার চেঁচামেচি নিয়ে, বিশেষ করে যখন তারা ঘরে একা থাকে। – আমাদের প্রতিবেশী রয়েছে, তিনি বলেন।
– আমি এটা বলতে চাই না যে গেইম খেলা সবসময়েই খারাপ। গেইম তাদেরকে সামাজিক করে তুলতে সাহায্য করেছে, বলেন বুশরা (ডানে)।
ছোটো এবং বড় খেলোয়াড়েরা
ফিল্মে আলৌ পরিবার!
ভিডিও লিংকঃ https://youtu.be/CGL03EsLrTg
নিত্যদিনের জীবনে গেইমিংয়ের প্রভাব দেখতে চান? তাহলে Blå Kors-এর এই ভিডিওটি দেখা উচিত। আলৌ পরিবারের দুভলান ও মোহাম্মদ (বামে) ছাড়াও চলচ্চিত্র নির্মাতা এখানে কথা বলেছেন আন্দ্রিয়া (৯) এবং মাদস (৫) এর সাথে। এরা দুজনও গেইম খেলতে পছন্দ করে। তাদের বাবা ইওনাস হাইয়ের স্ত্রাউমসহেইমও (Jonas Heier Straumsheim) গেইম ভালোবাসেন। তাঁর স্ত্রী পিয়া রোয়া নিহুসের (Pia Røe Nyhuser) বলেন সন্তানদের গেইম খেলা নিয়ে যত কথা হয়, তার চেয়ে বেশি হয় স্বামীর খেলা নিয়ে। বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে এখন গেইমের জন্য তাকে বেসমেন্টে পাঠিয়ে দিয়েছি।
কম্পিউটার গেইম অভিবাসী শিশুকে নতুন সমাজে মিশে যেতে সাহায্য করে
ভেস্তলান্দফসকিং (Vestlandsforsking)-এর গবেষণা বলছে স্কুল বন্ধুদের সাথে কম্পিউটার গেইম খেলা অভিবাসী কিশোর-কিশোরীদের জন্য বেশ উপকারী।
অভিবাসী কিশোর-কিশোরীরা কেন গেইম খেলে এবং পরিবারের নিত্যদিনের জীবনে এর প্রভাব নিয়ে গবেষনা করেছে ভেস্তলান্দফসকিং। গবেষকরা দেখেছেন শিশু-কিশোরদের ভাষার উন্নয়নে গেইমিংয়ের প্রভাব রয়েছে। এছাড়াও এটা তাদের স্থানীয় সমাজে মিশে যাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়। গেইমিংয়ে বেশ লম্বা সময় কাটায় এমন কিছু কিশোরদের সাথে কথা বলেছেন গবেষকগণ, তবে তাঁদের মতে এদের মধ্যে কারো খুব খারাপ পর্যায়ের আসক্তি নেই।
লিঙ্গভেদে ভিন্নতা
গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গিয়েছে অভিবাসী ছেলেদের চেয়ে অভিবাসী মেয়েরা কম গেইম খেলে এবং গেইমিংয়ে গড়ে কম সময় কাটায়। অধিকাংশ ছেলেরা কেবল ছেলেদের সাথেই খেলতে পছন্দ করে এবং তাদের পছন্দ যুদ্ধ, কৌশলগত এবং খেলাধুলা বিষয়ক গেইম। মেয়েদের পছন্দ অপেক্ষাকৃত কম হিংস্রতার গেইমগুলো।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব
প্রায়শই দেখা যায় সন্তানদের গেইম সম্পর্কে পিতা-মাতার খুব একটা ধারণা নেই। সন্তানের খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে তা পারিবারিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। অনেকেই মনে করেন গেইম বিষয়ক তথ্যগুলো তাদের জানা-বোঝার মতো ভাষায় থাকলে ভালো হতো। vestforsk.no লিখেছে, পিতা-মাতা মনে করেন কিশোর-কিশোরীদের ব্যস্ত রাখার জন্য বিকল্প নেটওয়ার্ক ও অন্য কার্যক্রমও থাকা উচিত।
অভিবাসী পরিবারে গেইমিং নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা ও উপদেশ সম্বলিত একটি বুকলেট প্রকাশ করেছে ভেস্তলান্দফসকিং। বইটি মোট পাঁচটি ভাষায় (ইংরেজি, নরওয়েজিয়ান, আরবি, তিগরিনিয়া ও দাড়ি) প্রকাশ করা হয়েছে। বুকলেটটি পাওয়া যাবে এখানেঃ vestforsk.no/sites/default/files/2020-06/insformasjonshefte.pdf